Home হজ আজ পবিত্র হজ: লাব্বায়িক ধবনিতে প্রকম্পিত আরাফাতের ময়দান

আজ পবিত্র হজ: লাব্বায়িক ধবনিতে প্রকম্পিত আরাফাতের ময়দান

6
0
SHARE

সৌদি আরবের হিজরী মাস গণনা অনুযাযী আজ ৯ জিলহজ বৃহস্পতিবার পবিত্র হজ। হাজীদের ‘উকুফে আরাফা’ বা আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিন। বিশ্ব মুসলমানের মহাসম্মিলনের দিন। আজ বিশ্বের ১৬০টির বেশী দেশের ২০ লাখেরও বেশী হাজীর কণ্ঠে উচ্চারিত ‘লাব্বায়িক আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক, লা-শারিকালাকা লাব্বায়িক’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত আরাফার আকাশ বাতাস। এক স্বগীয় আবহ পুরো ময়দানে। সবার পরনে সাদা দুই খন্ড বস্ত্র। সবার দীন বেশ। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, রহমত প্রাপ্তি ও নিজের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে অশ্রুসিক্ত ফরিয়াদ জানাচ্ছেন সমবেত মুসলমানেরা। একে অপরের সাথে পরিচিত হচ্ছেন, কুশল বিনিময় করছেন। বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এক অনুপম দৃশ্যেরও অবতারণা আজ এই ময়দানে।
আজ জোহরের নামাজের ওয়াক্তের আগেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা মুসলমানরা সমবেত হচ্ছেন মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে। প্রায় ১৪০০ বছর আগে এই ময়দানেই রাসূল (সা:) লাধিক সাহাবিকে সামনে রেখে ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। এই ময়দানেই ইসলামের পরিপূর্ণতার ঘোষনা দিয়ে কোরআনের আয়াত নাযিল হয়েছিল।
আরাফার ময়দান হেরেম এলাকার বাইরে কাবা শরীফ থেকে দক্ষিনপুর্ব দিকে অবস্থিত। এই ময়দান প্রায় সাড়ে ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত।
হাজীরা আজ আরাফাতের বিশাল প্রান্তরে অবস্থান করে মসজিদে নামিরাহ থেকে প্রদত্ত খুতবা শুনবেন এবং একসাথে জোহর ও আসরের নামাজ একই ইমামের পেছনে জোহরের ওয়াক্তে আদায় করবেন। সূর্যাস্তের পর ময়দান ত্যাগ করবেন।
টানা পাঁচদিন ধরে হজের আরো অনেক করণীয় থাকলেও আজ ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়াদানে অবস্থানের দিনকেই হজের দিন বলা হয়। হজের কার্যাদি আনুষ্ঠানিকভাবে পালন শুরু হয়েছে গতকাল ৮ জিলহজ বুধবার মিনার তাঁবুতে অবস্থানের মধ্য দিয়ে। ভিড় এড়াতে অনেক হাজী আগের দিন মঙ্গলবার রাত থেকেই মিনায় যাওয়া শুরু করেন। গতকাল বেশির ভাগ হাজীই মিনায় চলে যান। মিনায় গিয়ে তালবিয়া, জিকির, নফল নামাজ, হজের মাসলা-মাসায়েল আলোচনার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করেন হাজীরা। আজ ফজরের নামাজের পর সুর্যোদয়ের পর থেকে আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে হাজীদের রওনা হওয়ার নিয়ম। তবে ভিড় এড়ােেত অনেক হাজী গত রাতেই আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এবং সেখানে গিয়ে অস্থায়ী তাঁবুতে অবস্থান নেন। বাকিরা আজ সকালে মিনা থেকে সরাসরি আরাফার ময়দানে চলে যান। সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যস্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের অন্যতম ফরজ। কেউ এই সময়ের মধ্যে এই ময়দানে অবস্থান করতে না পারলে হজ আদায় হবে না। বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের সময়ের ব্যবধান তিনঘন্টা।
এই ময়দানে জোহরের সময় পর পর জোহর ও আসরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করবেন হাজীরা। মুসাফির হওয়ার কারণে নামাজ কসর করবেন (চার রাকাতের স্থলে দুই রাকাত)। নামাজের আগেই সৌদি গ্রান্ড মুফতি মসজিদে নামিরাহ থেকে খুতবা দেবেন। এর আগে পরে হজযাত্রীদের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘লাব্বায়িক’ ধ্বনিতে মুখরিত পুরো ময়দান। আমির-ফকির, ধনী-গরিব, সাদা-কালোর ভেদাভেদ থাকবে না সেখানে। সবার পরনে একই ধরনের সেলাইবিহীন কাপড়, আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ এবং তারই কাছে গুনাহ মাফ ও রহমত প্রাপ্তির আকুতি।
সূর্যাস্তের সাথে সাথেই আবার মিনায় ফেরার পথে মুজদালিফা নামক স্থানে রাতে অবস্থান নেবেন হাজীরা। ওই স্থানে রাতে অবস্থান করবেন খোলা আকাশের নিচে। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ এক সাথে আদায় করবেন। মীনায় জামারাতে শয়তানের প্রতিকৃতিতে নিেেপর জন্য এখান থেকেই কঙ্কর সংগ্রহ করবেন। রাতে সেখানে অবস্থানের পর কাল ১০ জিলহজ শুক্রবার ফজরের নামাজ শেষে মিনার দিকে রওনা হবেন। কাল সৌদি আরবে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। মিনায় গিয়ে জামারাতে কঙ্কর নিপে এবং কোরবানি করবেন। মিনায় কোরবানি করার পর হাজীরা মাথা মুন্ডন করে অথবা চুল ছোট করে ইহরাম ভেঙে ফেলবেন। এরপর তাওয়াফে জিয়ারাহ করার জন্য মক্কায় যাবেন। সেখানে হেরেম শরীফ সংলগ্ন সাফা-মারওয়া নামক পাহাড়দ্বয়ের মাঝে দৌঁড়াবেন (সায়ী করবেন)। জিলহজের ১১, ১২ তারিখ মিনার তাবুতে অবস্থান করেই জামারাতে কঙ্কর নিপে করার নিয়ম। ১২জিলহজ হজের আনুষ্ঠানিক কার্যাদির সমাপ্তি ঘটবে। কেউ ১২ তারিখ মীনা ত্যাগ না করলে ১৩ তারিখও তাকে জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করতে হবে। মিনার তাঁবুতে অবস্থান করেই পাঁচদিনের হজের কার্যাদি সম্পন্ন করবেন হাজীরা।
আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা একজন হাজীর জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়। যদিও এই অবস্থান হজের অন্যতম ফরজ। হাজীরা এই দিনটিসহ পুরো হজকার্য সম্পাদনের জন্য আজীবন স্বপ্ন লালন করেন।
হাদীস শরীফে এসেছে, রাসুল (স.) বলেছেন, এমন কোন দিবস নেই যেখানে আল্লাহ তায়ালা আরাফা দিবস থেকে বেশী বান্দাহকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এবং আল্লাহ নিশ্চয় নিকটবর্তী হন ও তাদেরকে নিয়ে ফেরেস্তাদের সাথে গর্ব করেন, বলেন, ওরা কী চায়? ( মুসলিম) । আরেক হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা আরাফায় অবস্থানরতদের নিয়ে আকাশবাসীদের সাথে গর্ব করেন। তিনি বলেন, আমার বান্দাহদের দিকে তাকিয়ে দেখ , তারা আমার কাছে এসেছে এলোথেলো ও ধুলায় আবৃত অবস্থায়। ( মুসনাদে আহমাদ)
আরাফাতের ময়দান দোয়া কবুলের জায়গা। এখানেই আদি পিতা আদম ও হাওয়া (আ:) এর পুনর্মিলন হয়েছিল এবং তাদের দোয়া কবুল হয়েছিল মর্মে বর্ণনা পাওয়া যায়। এই ময়দান রাসূল (সা:) এর বিদায় হজের ভাষণের স্মৃতিবিজড়িত। সূর্য হেলে পড়ারর পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাজীরা গ্রুপে এবং আলাদা আলাদাভাবে দোয়া করতে থাকেন। দুই হাত উঁচু করে অজোর ধারায় কান্নাকাটি করেন হাজীরা। গুনাহ মাফের আকুতি ছাড়াও জীবনের সব চাওয়াই আল্লাহর দরবারে পেশ করেন। সূর্যাস্তের পর আরাফার ময়দান ত্যাগের সময় নিজেকে নির্ভার-নিষ্পাপ জ্ঞান করে মুজদালিফার দিকে এগোতে থাকেন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ছুটে যাওয়া মুসলমানরা।
হজরত আদম (আ:) কর্তৃক নির্মিত পৃথিবীর প্রথম ঘর কাবাকে কেন্দ্র করেই মূলত: হজের কার্যাদি। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ:) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ:) এই কাবা ঘর পুন:নির্মাণ করেন। হজের অধিকাংশ কাজই হজরত ইব্রাহিম (আ:), তাঁর স্ত্রী হাজেরা এবং পুত্র ইসমাঈল (আ:) এর সম্পাদিত কাজের সাথে সম্পর্কিত। মুসলমানেরা পশু কোরবানি আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে ইব্রাহিম (আ:) কর্তৃক স্বীয় শিশুপুত্র ইসমাঈলকে কোরবানি করতে যাওয়ার মহান ত্যাগের ঘটনার সাথে সম্পর্কিত।
হজ ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম এবং সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ।
এ বছর ২০ লাখের বেশি মুসল্লি পবিত্র হজ পালন করছেন। এবছর বাংলাদেশী হজযাত্রীর সংখ্যা এক লাখ ২৭ হাজার । ##

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here